“এটা সহীহ ইসলাম না” “ইসলামি মূল্যবোধ এটা বলে না” এই কথা গুলা এই মূহুর্তে বইলেন না। বাংলাদেশে বর্তমানে সংখ্যালঘুদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন আর নিপীড়ন চলতেসে সেটাকে তো জাস্টিফাই করেই না বরং আলোচনা থেকে সরে গিয়ে একটা পালায়া যাওয়া অবস্থার তৈরি করে।
বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর যে অত্যাচার হইতেসে, সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর ধর্মীয় স্থান যে পুড়ায়া দেয়া হইসে স্বীকার করেন। এই স্বীকার করাটাও অনেক।
তারপর বইলেন যে দেখেন যারা এই অরাজকতা তৈরি করতেসে তারা তো মুসলিম না। তারা সন্ত্রাসী। তাঁদের কোনো ধর্ম পরিচয় নাই। এই কথাটা অনেক সুন্দর না? আমরা সবাই বলি।
কি সুন্দর করে দায়ভার টা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম।
তাইলে যারা এই মন্দির ভাংতেসে তারা কারা? তাঁদের পরিচয় কি? তারা কেন এগুলা করতেসে?
এই প্রশ্নের উত্তর কি আছে? আছে।
মন্দির ভাঙ্গতেসে বাংলাদেশের এমন মুসলিম যারা প্রচণ্ড পরিমাণের আইডেন্টি ক্রাইসিস এ ভোগে। তারা তাঁদের পরিচয়, তাঁদের অবস্থান নিয়া এতই শঙ্কিত যে ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে তাঁদের একটা বিশাল হিন্দুজনগোষ্ঠীর বাড়ি ঘর পুড়ায়া দিতে হয়, লুটপাট করতে হয়। মন্দিরে প্রতিমা ভাঙ্গতে হয়।
এখন এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এর ভোগার অনেক কারন আছে। উগ্রবাদ কে প্রমোট করে এমন ওয়াজ বক্তাদের উত্থান, সরকার এর ফেইক অসাম্প্রদায়িকতা দেখানো, তরুণ সম্প্রদায় কে রাজনৈতিক স্বাধীনতা না দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক কারন দেখানো যায়। বিশ্লেষণ করা যায়। সেটা আপাতত থাক।
এখন এই গোষ্ঠীটাকে নিয়া কি করা যায়? যারা ইসলামের অন্য কিছুতে নাই শুধু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদে অরাজকতা সৃষ্টিতে আছে? (তাও আসলেই ধর্ম অবমাননা না কিন্তু………..)
একটা উদাহরণ দেই। একদিন ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখি। আফগানিস্তানের সম্ভাবত। কয়েকজন মানুষ কিছু প্রতিমা ভাঙ্গতেসে। সেই ভিডিওটা ব্যাপক জোশ দিয়ে বানানো। উপরে ক্যাপশন দেয়া হযরত ইব্রাহিম (সা:) কাবা শরীফের মুর্তি ভেঙ্গেছেন। আফগানিস্তানের এই প্রানপ্রিয় ভাইয়েরাও ভেঙ্গেছেন। আর আমরা এই মূর্তি পাহারা দেই। শিরকে অংশগ্রহণ করি। পূজায় অংশগ্রহণ করি। কি কুলাঙ্গার মুসলিম আমরা।
অনেকটা এরকম ধরনের একটি ক্যাপশন। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এরকম ভিডিওতে সাধারণত হা হা কমেন্ট দেখি আমি। তবে ওই দিন প্রথম খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম প্রচুর লাভ রিএক্ট। এবং এমন কিছু মানুষের লাভ রিএক্ট যাদের কে স্কুল কলেজে বসে আমি খুবই শান্তিপ্রিয় বিবেকবান মানুষ মনে করতাম।
পরে আরো কিছু গ্রুপ পেইজ ঘাইটা দেখলাম বাংলাদেশ এখন ইসলামের র্যাডিকালাজিমের তুঙ্গে।
আপনার আশে পাশের মানুষের দিকে তাকালেই এটা বুঝতে পারবেন। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নির্যাতন দেখে তারাও মনে মনে ডিসসাইড করে নিসে “ ইসলাম ক্ষাত্রে মে হে”।
এখন ইসলাম কে বাচানোর জন্য যত দুর যাওয়া প্রয়োজন ততদুর যাবে তারা। আগে এই টাইপের মানুষরা আইসিস এ জয়েন করার জন্য সিরিয়া যাইতো। এখন বাংলাদেশেই সেই অবস্থা তৈরি হইসে। সিরিয়া যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
আমাদের দেশে অন্য এক ইসলাম চর্চা করা হচ্ছে। কোর ভ্যালু এচিভ না কইরা কালো পতাকার গুণগান করা হচ্ছে, প্রতিমা আর ভাস্কর্য কে এক ভাইবা দুইটাই উৎখাত করার কথা ওপেনলি গর্জন করে বলা হচ্ছে।
“আমরা সবাই তালেবান বাংলা হবে আফগান” এই কথাটা আপনার খুব ভালো লাগতে পারে। আমার, আমাদের লাগে না। আমরা বাঙ্গালী, বাংলাদেশি, বাংলাদেশে থাকি। এইটারে চীন, কিউবা, সিংগাপুর, আফগানিস্তান কিছুই বানাইতে চাই না। বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশ চাই।
হেফাজতের আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালাইলে আমরা সেটার প্রতিবাদ করি, তালেবানদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য তাঁদের অতীত কে ক্ষমা করে দেই, পশ্চিমা দেশে ইস্লামোফোব কেন এত বেশি এগুলা নিয়া কান্নাকাটি করি। নিজদেশে যে আগুনে পুইরা যাইতেসে সেটা বুঝতেসি না। আমরা বুঝি এটা সহীহ ইসলাম না। অনেকে আবার মনে করে হ্যাঁ এটাই সহীহ ইসলাম, কাবা শরীফের মুর্তি ভাঙ্গা হইসিলো। আমরাও এখন মুর্তি ভাঙবো।
আগুনের সামনে একজন মানুষ দাড়ায়া আসে, তার ধর্মীয় স্বাধীনতা, উৎসব পালনের স্বাধীনতা, এমনকি নিজের ঘরে শান্তিতে থাকার স্বাধীনতা টুকুও কেও ইসলামের নাম দিয়া কাইরা নিলো। স্টেজড ধর্ম অবমাননা কারন দেখাইয়া আগুন লাগাইয়া দিলো। লোকটা আগুনের সামনে দাড়ায়া আসে। আর আপনি পাশ থেকে চিল্লাইতেসেন এটা সহীহ ইসলাম না। ইসলাম এটা বলে না।
আগুনটা নিভাইতেসেন ও না, কেরোসিন এর যোগান ও বন্ধ করতে পারতেসেন না। তাইলে পারতেসেন টা কি? চিল্লাইতে?
লজ্জা লাগে না? পারলে এখন থেকে আপনার পাশের ছুপা ছাগুরে আইডেন্টিফাই করেন। তারে একটু চোখে চোখে রাখেন। পারলে একটু বুঝান। ধর্ম অবমাননতার প্রতিবাদ বাদেও ইসলামের যে আরো গুরত্বপূর্ন দিক আসে সেটা বলেন। জান্নাত পাইতে গেলে শুধু ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদ করলেই হয় না। নামাজ,রোজা, হজ্ব, যাকাতও করা লাগে।
হাজার বছর আগের হজরত ইব্রাহিম (আ:) আর মুর্তি ভাঙ্গা কেন আজকের বিশ্বে রিলেভেন্ট না সেটা পারলে বুঝান।
দায় নিতে শিখেন আপনিও মুসলিম ,যারা আজকে এই কাজ গুলা করলো তারাও নিজেদের মুসলিমই দাবি করে। শিয়া বা আহমেদিয়া দাবি করে না। তাইলে আপনার আর তার মধ্যে পার্থক্য কি?
আপনি “লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালিয়াদিন” বলে স্ট্যাটাস দেন আর তারা “সুরা হিজর এর আয়াত” বলে স্ট্যাটাস দেয় এই টুকুই?
দায়ভারটা নিতে শেখেন। একটু দায়িত্ব পালন করেন।
.jpg)
Comments
Post a Comment